‘কোরআনে বৈজ্ঞানিক ভুল’ — একটি বহুস্তরীয় খণ্ডন
শাস্ত্রীয় তাফসির, আধুনিক বিজ্ঞান, ভাষাতাত্ত্বিক বিশ্লেষণ ও দর্শনের আলোকে কথিত ‘বৈজ্ঞানিক ভুল’-এর পুনঃপর্যালোচনা — যেখানে কখনও কখনও প্রচলিত মূলধারার ব্যাখ্যা থেকেও আমরা ভিন্নমত পোষণ করি।
অভিযোগ ১: সূরা কাহফ ১৮:৮৬ অনুযায়ী সূর্য ‘কর্দমাক্ত জলে’ অস্ত যায় — যা মহাজাগতিকভাবে ভুল।
অভিযোগ ২: সূরা আম্বিয়া ২১:৩০ ‘আকাশ ও পৃথিবী একসাথে ছিল, পরে আমরা বিচ্ছিন্ন করেছি’ — কখনও বলা হয় Big Bang-এর সাথে এটি সাংঘর্ষিক, আবার কখনও বলা হয় এটি অনুপ্রবেশকৃত concordism।
অভিযোগ ৩: কোরআন পৃথিবীকে ‘সমতল’ বা ‘বিছানার মতো’ বলেছে — তাই এটি প্রাচীন cosmology-র প্রতিফলন, ঐশী জ্ঞান নয়।
অভিযোগ ৪: ভ্রূণতত্ত্ব (২৩:১২–১৪) আধুনিক বিজ্ঞানের সাথে মিল রাখে না; এটি গ্যালেনের প্রাচীন তত্ত্বের পুনরাবৃত্তি।
১. পদ্ধতিগত ভিত্তি — আমরা কেন এই অভিযোগগুলোকে সিরিয়াসলি নিচ্ছি
একজন প্রকৃত মুসলিম পাঠক জানেন যে কোরআন একটি বৈজ্ঞানিক পাঠ্যপুস্তক নয় — এটি هداية (নির্দেশনা)-র গ্রন্থ। কিন্তু এর অর্থ এই নয় যে কোরআনের কসমোলজিক্যাল ভাষাকে আমরা ‘রূপক’ বলে যেকোনো প্রশ্ন এড়িয়ে যাব। এটি apologetic দুর্বলতা।
আমাদের পদ্ধতি তিনটি স্তম্ভের ওপর দাঁড়িয়ে: (ক) শাস্ত্রীয় তাফসিরের পুনঃপাঠ — কারণ ক্লাসিক্যাল মুফাসসিরগণ আধুনিক apologetics-এর চাপে ছিলেন না; (খ) ভাষাতাত্ত্বিক ও সাহিত্যিক বিশ্লেষণ — কারণ কোরআন আরবি, এবং অনুবাদ বহু সমস্যার উৎস; (গ) যৌক্তিক ও দার্শনিক যাচাই — যেখানে আধুনিক বিজ্ঞানের সাথে সংঘাত আপাত মনে হলে, প্রথমে আমরা নিজেদের ব্যাখ্যাকে প্রশ্ন করি, অন্ধভাবে concordism চাপাই না।
এই কারণে কখনও কখনও আমরা মূলধারার apologetic ব্যাখ্যার সাথেও ভিন্নমত পোষণ করি — কারণ সত্য পক্ষপাতের ঊর্ধ্বে।
২. সূর্য ‘কর্দমাক্ত জলে’ অস্ত যায় (১৮:৮৬) — ভাষা, দৃষ্টিকোণ, ও মূলধারার ব্যাখ্যার সমালোচনা
আয়াতটির আরবি: ‘حَتَّى إِذَا بَلَغَ مَغْرِبَ الشَّمْسِ وَجَدَهَا تَغْرُبُ فِي عَيْنٍ حَمِئَةٍ’। মূল ক্রিয়াপদ ‘وجدها’ — অর্থ ‘সে দেখতে পেল’। এটি একটি subjective perception-এর বর্ণনা, objective cosmological assertion নয়।
প্রসিদ্ধ মুফাসসির ফখরুদ্দীন আল-রাজী (মাফাতীহ আল-গায়ব) স্পষ্টভাবে বলেছেন: এটি যুল-কারনাইন যা দেখলেন তার বর্ণনা; কোরআন দাবি করছে না যে সূর্য আক্ষরিক অর্থে কাদায় ডুবে যায়।
অনেক আধুনিক apologist দাবি করেন আয়াতটি ‘সূর্যাস্তের দৃশ্যমান দিগন্ত’ বোঝায় — এই ব্যাখ্যা সঠিক, কিন্তু অনেকে এতে আরও যোগ করেন যে এটি নাকি ‘সমুদ্রের প্রতিফলন’ বা ‘অস্ত-উদয়ের relativity’র ইঙ্গিত। এটি concordist বাড়াবাড়ি — পাঠ্যে এর কোনো সমর্থন নেই, এবং আমরা এটি প্রত্যাখ্যান করি।
সঠিক জবাব সরল: এটি একটি narrative perspective, যেমন আজকের আবহাওয়াবিদও বলেন ‘sunrise/sunset’ — যদিও তিনি জানেন পৃথিবী ঘূর্ণনশীল।
৩. ‘আকাশ ও পৃথিবী এক ছিল’ (২১:৩০) — Big Bang কনকর্ডিজমের সমালোচনা
মূলধারার দাওয়াহ-উপস্থাপনায় বলা হয় এই আয়াত Big Bang-এর সরাসরি ইঙ্গিত। আমরা মনে করি এই দাবী পদ্ধতিগতভাবে দুর্বল।
প্রথমত, ক্লাসিক্যাল মুফাসসিরগণ (তাবারি, ইবন কাসির) এই আয়াতকে কখনোই cosmological singularity-র অর্থে বোঝাননি — তাঁরা ‘رتق’ (একসাথে)-কে মূলত আকাশ থেকে বৃষ্টি না-পড়া এবং পৃথিবী থেকে গাছ না-গজানোর অবস্থা হিসেবে ব্যাখ্যা করেছেন।
দ্বিতীয়ত, Big Bang ‘heavens’ বনাম ‘earth’-এর বিচ্ছিন্নতা বোঝায় না — এটি spacetime-এর প্রসারণ। এক-এক করে শব্দ মেলালে আয়াতটি Big Bang বোঝায় না; বরং একে নাকি Big Bang বোঝাচ্ছে — এমন দাবি অনার্য পাঠ।
তবু এর অর্থ এই নয় যে আয়াতটি ‘ভুল’। এটি একটি কাব্যিক, theistic বিবৃতি যে মহাবিশ্বের একতা ও বিন্যাস ঐশী হস্তক্ষেপের ফল। আধুনিক বিজ্ঞান এই থিওলজিক্যাল দাবিকে খণ্ডন করে না।
অর্থাৎ অভিযোগটি ‘কোরআন বৈজ্ঞানিক ভুল করেছে’ — মিথ্যা, কিন্তু apologetic-এর ‘কোরআনে Big Bang আছে’ — এটিও অতিরঞ্জন।
৪. পৃথিবী কি ‘সমতল’ — শব্দার্থ বনাম জ্যামিতি
অভিযোগে যে শব্দগুলো দেখানো হয়: ‘فراش’ (২:২২), ‘مهاد’ (৭৮:৬), ‘سُطِحت’ (৮৮:২০)।
ভাষাতাত্ত্বিকভাবে ‘فراش’ মানে যা বিছিয়ে দেওয়া হয়েছে — অর্থ ‘বাসযোগ্য করে তোলা’। আরবি অভিধানে এটি জ্যামিতিক চ্যাপ্টা-চাকা (geometric flatness) বোঝায় না।
‘سُطِحت’ ক্রিয়াটি একই ভাষাগত ক্ষেত্রভুক্ত। ক্লাসিক্যাল আরবরা সকলেই জানতেন উট-চড়া-পৃথিবীর পৃষ্ঠ স্থানীয়ভাবে সমতল মনে হলেও সম্পূর্ণটি গোলাকার — এটিকে ‘flat-earth claim’ বানানো ভাষাগত অনাচার।
একই কোরআনে ৭৯:৩০ — ‘دحاها’ (পৃথিবীকে ডিম্বাকার করে বিছিয়ে দিয়েছেন)। শব্দটির মূল ‘دحو’ — উটপাখির ডিমের আকৃতি; শতাব্দী আগে ইবন আব্বাস (রা.)-ও এমন ব্যাখ্যা দিয়েছেন।
তবে এখানেও আমরা একটি অতিরঞ্জনের বিরুদ্ধে সতর্ক করি: ‘دحاها’ মূলত ‘বিস্তৃত করা’; ‘ডিম্বাকার’ অর্থ একটি বৈধ secondary lexical possibility, এটিকে ‘কোরআনে oblate spheroid’ বলে চাপিয়ে দেওয়া concordism।
৫. ভ্রূণতত্ত্ব (২৩:১২–১৪) — গ্যালেন তত্ত্বের অভিযোগের পুনঃমূল্যায়ন
অভিযোগ: কোরআনের ভ্রূণতত্ত্ব নাকি গ্যালেনের চারটি স্তরের তত্ত্বের পুনরাবৃত্তি, এবং এতে نطفة → علقة → مضغة ক্রমটি modern embryology-র সাথে মেলে না।
প্রথম প্রতিক্রিয়া: গ্যালেনের তত্ত্ব মানুষের শুক্র + নারীর শুক্রের মিশ্রণ-এর ওপর দাঁড়িয়ে; কোরআনে এই Galenic বিষয়টি অনুপস্থিত। অর্থাৎ লেখক যদি ‘গ্যালেন-নকল’ করতেন, তবে গ্যালেনের কেন্দ্রীয় তত্ত্বটিই বাদ পড়ার কথা নয়।
দ্বিতীয়ত, ‘علقة’ শব্দের কেবল ‘blood clot’ অনুবাদটি অসম্পূর্ণ। এর প্রকৃত semantic range — ‘যা ঝুলে আছে / আঁটকে আছে’ (leech-like)। ৪র্থ-৫ম সপ্তাহের embryo যে morphologically leech-সদৃশ এবং uterine wall-এ ‘ঝুলে থাকে’ — এটি আধুনিক embryology-র সাথে সঙ্গতিপূর্ণ।
তৃতীয়ত, ‘مضغة’ — ‘চিবানো মাংসপিণ্ড’ — somite formation-এর সময় embryo-র খাঁজকাটা চিবানো-চামড়ার মতো চেহারা একটি যথাযথ observational metaphor।
তবে আবারও সততার দাবিতে বলি: এই আয়াতগুলো microscopic biology-র dictation নয়; এগুলো সামনে দাঁড়ানো একজন পর্যবেক্ষকের ভাষায় ভ্রূণের পর্যায়সমূহের কাব্যিক বর্ণনা — এবং সে বর্ণনা যথেষ্ট সঠিক।
৬. উপসংহার — দুই প্রান্তিক চরমতার প্রত্যাখ্যান
কোরআনে ‘বৈজ্ঞানিক ভুল আছে’ — এই দাবি ভাষাগত অনার্যতা ও context-অজ্ঞতার ফল।
আবার ‘কোরআনে আধুনিক বিজ্ঞানের সব প্রমাণ আছে’ — এই apologetic উপস্থাপনাও পদ্ধতিগতভাবে ত্রুটিপূর্ণ এবং দীর্ঘমেয়াদে ক্ষতিকর।
সঠিক অবস্থান: কোরআন এমন একটি গ্রন্থ যা ৭ম শতাব্দীর শ্রোতাকে তার ভাষায় বিশ্বের শৃঙ্খলা ও সৃষ্টিকর্তার দিকে ইশারা করে — এবং সেই ইশারাগুলো আজকের বিজ্ঞানকেও খণ্ডন করে না। এটিই যথেষ্ট, এর বেশি দাবি অপ্রয়োজনীয়।
- Fakhr al-Dīn al-Rāzī, Mafātīḥ al-Ghayb
- al-Tabari, Jāmiʿ al-bayān ʿan ta'wīl āy al-Qur'ān
- Ibn Kathir, Tafsīr al-Qur'ān al-ʿAẓīm
- Nidhal Guessoum, ‘Islam's Quantum Question’ (2011)
- Basim Musallam, ‘Sex and Society in Islam’ (1983) — on Galen comparison
